ছোট গল্প

মুখ -মুখোশ

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ১০ মার্চ ২০২৬, ০৯:৩৪ পিএম

শিশির অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে বাবার দিকে ।নিশি তখন কিছু একটা বলছিলো । কী বলছিলো?কাকে বিয়ে করবে বলছিলো ! কোন এক ছেলের নাম করছিলো না ! কি যেন তার নাম?ও হ্যা মনে পড়েছে,নাম হলো -অন্তুু, ওদের সাথে এক ক্লাশে পড়ে । খোঁজ নিতে হচ্ছে যুবকটার । দেখতে হবে আপু কী এমন দেখলো ওর মধ্যে যে মরণ পণ করে বসেছে বিয়ে করলে ওকেই করবে , না হলে নয় !
শিশির পরদিন ক্লাশ অফ করে চলে এলো জাহাঙ্গীর নগর ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে ।নিশি আগেই চলে এসেছে । শিশিরকে বেশী খুঁজতে হলো না । দেখলো , কালো মতো একটা ছেলের সাথে শিশিরের আপু হেসে হেসে কথা বলছে ক্যাম্পাসের এক পাশে দাঁড়িয়ে ।

ওই যুবকই তাহলে অন্তুু ! চেহারা দেখে তেমনটাই মনে হচ্ছে । শিশির দূরত্ব বজায় রেখে মেপে নিতে থাকলো তাকে । একমাথা কালো ঝাঁকড়া চুল । কালো পুরু ঠোঁট । চোখে মোটা কাঁচের চশমা ! দেখে বোঝা যাচ্ছে খুবই মেধাবী ছাত্র । শরীরটাও বেশ মজবুত গড়নের । ওর মতো দু-তিনটা যুবককে একলাই সামলে নিতে পারবে ।

রাত্রে খাবার টেবিলে যথারীতি প্রাত্যহিক আড্ডা চলছে । বাবা গম্ভীর হয়ে আছেন । বাবা তার অফিস কলিগ ফারুক সাহেবকে কথা দিয়েছেন তাঁর ছেলের সাথে নিশির বিয়ে দিবেন । ছেলেটার অনেক পড়াশোনা । বিদেশে নামী একটা কোম্পানিতে উঁচু পোষ্টে চাকুরী করে । মোটা অঙ্কের মাস মাহিনা । একেবারে হীরের টুকরো ছেলে । এখন কিছুদিন ঢাকাতেই আছে অফিসের কী একটা কাজ নিয়ে । সেদিনও নিশির সাথে কথা বলে গিয়েছে যেচে পড়ে । ওরা আবার প্রতিবেশী সুরমাদের দূর সম্পর্কের আত্মীয় । এমন ছেলে হাতছাড়া করতে চান না বাবা । অথচ মেয়েকে কিছুতেই বাগে আনতে পারছেন না ।

কথাটা শিশিরই তুললো সকলের সামনে - “হ্যাঁ রে আপু... ওই আদিবাসী ছেলেটার মধ্যে কী এমন দেখেছিস যে এতোটা ভালো লেগে গেল তোর ?

নিশি ভাতের ছোট্ট একটা দলা মুখে তুলতে গিয়েও হাত নামিয়ে ভাইয়ের চোখে চোখ রেখে জবাব দিলো – চেহারাটাই সবকিছু নয় রে ভাইয়া। গরীব আদিবাসী হলেও অন্তুু প্রকৃতই একজন ভালো মানুষ ।

- কী এমন মানুষের মতো কাজ করে দেখিয়েছে শুনি ? বাবার গলায় স্পষ্ট রাগের ছাপ ।

- সে তোমরা বুঝবে না । সবকিছু ভাষায় প্রকাশ করা যায় না বাবা । অনুভব করতে হয় নিজের জীবন দিয়ে ।

ব্যাপারটা জটিলতার দিকে গড়াচ্ছে দেখে মা নেমে পড়লেন আসরে - আহ্‌ নিশি, বাবার মুখে মুখে কথা বলছো কেন ? এই শিক্ষা পেয়েছো আমাদের কাছ থেকে?

নিশি কথা না বাড়িয়ে খাওয়া শেষ করে উঠে পড়লো । হাত ধুতে যাবার আগে সবাইকে শুনিয়ে গেল – কম মানুষ তো দেখলাম না তোমাদের এই সভ্য সমাজে । তাই মানুষ চিনতে মোটেও ভুল হয়নি আমার ।

বাবা বুঝলেন মেয়ে কেন বললো এই কথা । শিশির অবাক হলো এই দেখে যে, আপুর কথায় বাবা-মা কোনো প্রতিক্রিয়াই দেখালেন না ! শিশির তবুও অন্তুু নামের ওই যুবকটাকে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না ।

ঘটনাটা দিন পনেরো পরই আচমকা ঘটে গেল । শিশির অনেক আগে ফিরে এসেছে ইউনিভার্সিটি থেকে । নিশি এখনো ফেরেনি ।মা, চিন্তায় ডুবে থেকে পায়চারি করছেন গ্রিলে ঘেরা খোলা বারান্দায় । বাবার অফিস থেকে ফিরে আসার সময় হয়ে এলো অথচ মেয়েটার আজ কি হলো ?

এমন সময়ে একটি সি এন জি এসে দাঁড়ালো বাড়ির সামনে ।মা দেখলেন , নিশি বাবাকে ধরে ধরে নামাচ্ছে সি এন জি থেকে । দেখেই ছুটে গেলেন ছেলেকে ডেকে নিয়ে । বাবার মাথায় ব্যান্ডেজ । তাঁকে ধরে এনে শুইয়ে দেওয়া হলো বিছানায় । নিশি নিজের ঝোলা ব্যাগ থেকে একগাদা ওষুধ বের করে মায়ের হাতে দিয়ে বললো – আমার দাঁড়ানোর সময় নেই । প্রেসক্রিপশন মিলিয়ে ওষুধ খাওয়াতে হবে বাবাকে । আমি যাচ্ছি ।

- কোথায় যাচ্ছিস মা ? বলে যা....

- মর্গে । ওরা অন্তুর বডিটা তুলে দেবে ঘণ্টা খানেকের মধ্যে । বন্ধুরা অপেক্ষা করছে আমার জন্য ।

- সেকী রে ! কী করে হলো ? কোনো আক্সিডেন্ট ! মায়ের গলায় ভয়ের সাথে উৎকণ্ঠার মিশেল ।

- ওই তো বাবাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়েছিলো ছুটন্ত ট্রাকের সামনে থেকে । নইলে বাবা এতক্ষণে...নিশির গলা বুজে এলো কান্নায় ।

- বাবাকে পেলি কোথায়? শিশির অবাক গলায় জানতে চাই ।

- সেকথা নাহয় বাবাকেই জিজ্ঞেস করিস ভাই । আমার আর দাঁড়ানোর উপায় নেই । যাই মা । মিলি ছুটে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে । সি এন জি টা তখনো দাঁড়িয়েছিলো । নিশিকে তুলে নিয়েই ছুটলো হাসপাতালের দিকে ।

বাবা খানিকটা ধাতস্ত হয়ে অবশেষে আফসোসের গলায় বললেন – আজ ওদের ইউনিভারসিটিতে গিয়েছিলাম অন্তু নামের ওই ছেলেটাকে উচিৎ শিক্ষা দেবো বলে । অথচ দ্যাখো , ছেলেটাই উলটে নিজের জীবন দিয়ে চরম শিক্ষা দিয়ে গেল আমাকে । আজ মেয়েটা আমাদের হারিয়ে দিলো গো । ভাবতেও অবাক লাগে , আজকের এই সভ্যসমাজে আমরা কিনা চকচকে চেহারার মানুষগুলোর মধ্যে প্রকৃত মানুষ খুঁজে বেড়াই ! ভুলে যাই যে দেখার চোখ নয় , মানুষ চিনতে লাগে... ভালো একটা মন যা আমাদের নিশি মা পেয়েছে ।

লেখক ও কবি: রোশনী ইয়াসমীন।

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com